খোলা মত

একটি মানবিক আহ্বান : খাদ্য কষ্ট থাকলে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করুন

  জাগো নরসিংদী ১৭ অক্টোবর ২০২১ , ৬:৫৮:পূর্বাহ্ণ অনলাইন সংস্করণ

নূরুদ্দীন দরজী

লেখার শিরোনামটি আমরা প্রায়‌ই পত্রিকার পাতায় দেখতে পাই। বিশেষ করে করোনা কালীন সময়ে কথাটি বেশি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এটি একটি মানবিক আহ্বান যা দ্বারা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। খাদ্য পাওয়া মৌলিক অধিকার। মানুষের কয়েকটি মৌলিক অধিকারের প্রথমেই আসেে অন্ন বা খাদ্যের কথা। অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলো হচ্ছে -যেমন অন্ন,বস্ত্র,বাসস্হান ও চিকিৎসা।

বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের কোন‌ই বিকল্প নেই। খাদ্য ছাড়া মানুষ কোনক্রমেই বাঁচতে পারেনা। আর বাঁচতেই না পারলে অন্যান্য চাহিদা বা অধিকার নিষ্প্রয়োজন। তাই খাদ্য এক নম্বর মৌলিক অধিকার। মোলিক অধিকারের মুখপাত্র ক্ষণজন্মা বাঙালি তরুন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন,”ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি,। জর্জ বার্ণাডশো বলেছেন” There is no sincer love than the love of food,. খাদ্যের অভাবে অস্বিত্ব বিপন্ন হয়ে ক্রমান্নয়ে মানুষ নিঃশেষ হয়ে যায়।

শুধুই মানুষ কেন,কোন প্রাণিই খাদ্য ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। প্রাণি দেহে পুষ্টি ও শক্তির জন্য খাদ্য প্রয়োজন। এ জন্যই স্বীকার করা হয় খাদ্য প্রথম মৌলিক মানবাধিকার। প্রতিটি সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় কর্তব্য তার নাগরিকদের খাদ্য সংস্হানের পথ দেখানো। নাগরিকগণের খাদ্য সংগ্ৰহে সহায়তা করা।

আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এ দেশের সমগ্ৰ কর্মকাণ্ডই জনগণ কেন্দ্রিক। সকল নাগরিকের সুযোগ সুবিধার প্রতি নজর রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করে থাকে। রাষ্ট্রের নিকট তার সকল নাগরিক সমান। দেশের কোন নাগরিক অভুক্ত থাকলে সোনার বাংলা গড়ার কার্যক্রম ব্যাহত হয়, রাষ্ট্র তার নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া কেউ অভুক্ত থাকবে এটি কারও কাম্য নয়। আর এমনি তাগিদ থেকেই” ফোন করলেই খাদ্য সহায়তা পৌছে যাবে, আহ্বান। বলা হয় খাদ্যে কষ্টে ৩৩৩ নম্বরে ফোন করতে। এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক আহবান। এ দেশের কোন মানুষ অভুক্ত থাকবে না এমন প্রচেষ্টা থেকেই এ আহবান।
সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ একদিন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। আমাদের ছিল গোলা ভরা ধান,পুকুরে ভরা মাছ, ছিল গোয়ালে ভরা গরু। বাংলাদেশের প্রাচুর্যে বিদেশি পর্যটকরা অভিভূত হয়ে পড়তেন। কেহ বা প্রশংসা করতেন। আবার বেনিয়া লুটেরার দল পড়ে যেতো লোভে। সোনার বাংলার সম্পদ লুটে নেওয়ার জন্য একের পর এক পায়তারা করতো। তাদের অশুভ দৃষ্টি দিনের পর দিন আমাদের করেছে নিঃস্ব। ফরাসী, ডাচ,পর্তুগিজ,ওলন্দাজ ও ইংরেজদের লোভে বাংলা হয়েছে সর্বশান্ত। ইংরেজরা ঘেড়ে বসেছিল পাকা খুঁটি। দীর্ঘ দিন নির্যাতন,শোষণ,আর অত্যাচারে করেছিল জর্জরিত। ইংরেজ চলে যেতে বাধ্য হলে ধর্মের দোহাই দিয়ে জুড়ে বসে পাকিস্তান। তাদের শাসনের নামে শোষণ বৈসাম্য দিনের পর দিন আমরা পিছিয়ে পড়ি। বুবুক্ষ থেকে থেকে আমাদের হয়েছিল কংকালসার দেহ। রক্ত,মাংস ও হাড় দিয়ে গঠিত শরীরে দেখা যেতো শুধুই হাড়। রক্ত শূন্য হয়ে পড়েছিল আমাদের দেহের কাঠামো। তার মাঝে আবার অকাল দুর্ভিক্ষ ও মনন্মরে খাজনা দেওয়ার জন্য নিষ্ঠুর বেনিয়ারা চালাতো অত্যাচারের ষ্টিম রোলার। শরীরের রক্ত মাংস বিক্রি করে হলে ও বিদেশি প্রভুদের খাজনা দিতে হতো।

আশ্বিন-কার্তিক মাসে বাতাসে ভেসে বেড়াতো বুবুক্ষ মানুষদের করুন আর্তনাদ। রাতের বেলা শোনা যেতো গ্ৰাম হতে গ্রামান্তরে অনাহারীদের কান্নার আওয়াজ। পড়ে থাকতো প্রাণহীন দেহ। খাদ্য ও বস্ত্রহীনদের দেখাতো বিভৎস। এ সবের মাঝে ছিল না আবার কথা বলার অধিকার। শোষণে নির্যাতনে আমরা ছিলাম রিক্ত ও কপর্দকহীন। অন্ন, বস্ত্র,বাসস্হান ও চিকিৎসা পাওয়ার মত মৌলিক অধিকারগুলো থেকে ছিলাম সম্পূর্ণ বঞ্চিত। মানবাধিকার

ছিল ভুলুন্ঠিত । সে অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অনেক জীবন ক্ষয় করতে হয়েছে। করতে হয়েছে আমৃত্যু সংগ্ৰাম। লক্ষ লক্ষ প্রাণ দিতে হয়েছে বিসর্জন।ব্রিটিশদের তাড়ানোর পর বঙ্গবন্ধুর আহবানে সমগ্ৰ বাঙালি সাড়া দেয়। পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে নেমেছিল সশস্ত্র সংগ্ৰামে, করেছে মুক্তির জন্য যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ। হারাতে হয়েছে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। মা বোনেরা দিয়েছেন মহা মূল্যবান ইজ্জত। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। মুক্ত দেশে সগৌরবে দণ্ডায়মান আছে রক্তে মিশ্রিত লাল সবুজের পতাকা। আমাদের দেশ আমরাই করছি শাসন। আমাদের ভাগ্য গড়ে তুলছি আমরাই। আমাদের সরকার কাজ করে মানুষের জন্য ও মানবতার জন্য। মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য।
আর কেউ থাকবে না অনাহারে,কোনক্রমেই থাকবে না অভুক্ত। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে গড়া বাংলাদেশে কেউ যেন খাবারের কষ্ট না পায় সেদিকে সরকারের সজাগ দৃষ্টি নিবদ্ধ।

তাইতো আজকে একটি মানবিক আহবান,কেউ খাদ্য কষ্টে থাকলে ৩৩৩ নম্বরে ফোন দিন, খাদ্য পৌছে যাবে। এর দ্বারা আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি বাঙালি এখন আর বুবুক্ষ থাকে না। আমরা আমাদের জন্য, প্রত্যেকে আমরা পরের জন্য। এ আহবানের মাধ্যমে কে কাকে কতটুকু সহায়তা দিয়েছেন বা কে কতটুকু পেয়েছেন আমার জানা নাই। কিন্তু এমন একটি মানবিক আহবানের কথা চিন্তা করে আমি দারুনভাবে প্রশান্তি পাই। প্রশান্তি পাই এ জন্য যে আমাদের খাদ্য আছে এবং আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বিশ্ব খাদ্য দিবস এর সৌজন্যে।লেখকঃ সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)