খোলা মত

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ইতিহাসের এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা

  জাগো নরসিংদী ২৮ আগস্ট ২০২১ , ১২:২৫:অপরাহ্ণ অনলাইন সংস্করণ

নূরুদ্দীন দরজী

আগস্ট বাঙালি জাতির শোকের মাস। এ মাসে আমাদের স্বাধীনতার স্হপতি, হাজারো বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পিচাশ বিশ্বাসঘাতকেরা নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছে। তিনি হত্যার শিকার হয়েছেন পরিবার পরিজনসহ। সমগ্ৰ বিশ্বে বিশ্বাসঘাতকেরা যত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে পৈচাশিকতার বিচারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা অন্য সবকে ম্লান করে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এ বছর যখন শোকাবহ আগস্টে জাতীয় শোক পালন করছে চন্দ্রমাসের ঘূর্ণনে চলে এসেছে হিজরি মহররম যে মাসে কারবালা প্রান্তরে বিশ্ব নবীর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রাঃ)কে ও পরিবারবর্গসহ নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিলো। মহররম বিশ্ব মুসলিমের জন্য শোকেবহ মাস। এক‌ই ভাবে বাংলার মানুষের জন্য ও আগস্ট মাস কোনক্রমেই কম নয় আর ও বেশি শোকের মাস। সারা পৃথিবীতে বাঙালি জাতির পরিচিতি আছে। বাঙালি নিরিহ,শান্ত ও ভদ্র জাতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে সাহিত্যে বাঙালির অবস্হান বিশ্বে অনেক উর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধুর জন্য সমগ্ৰ পৃথিবী আমাদের চিনে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে,মাত্র গুটি কয়েক বিশ্বাসঘাতকের জন্য মাথা নিচু হতে হয়। এ বিশ্বাসঘাতকদের প্রকৃতি,ধরণ ও চরিত্র বিচারে এমন বিশ্বাসঘাতক অন্যান্য দেশে খুব‌ই কম। বেঈমানীতে এদের সাথে কুলিয়ে উঠা ভার।

বিশ্বের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পৌরাণিক যুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত অনেক বিশ্বাসঘাতক স্বীয় জাতির বহুবিধ ক্ষতি করেছে। দুশ্চরিত্র বান ইয়াজিদের কথায় বিশ্বাস করেই ইমাম হাসান (রাঃ) শান্তির উদ্দেশ্যে কুফায় যাত্রা করেছিলেন। এ বিশ্বাসের বদৌলতে কারবালায় তাঁকে জীবন দিতে হয়েছে। জুলিয়ার্স সিজার তাঁর একান্ত বন্ধু ব্রুট্টাসের চরম বিশ্বাসঘাতকতায় নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন। সীতা হরণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছিলো রাম ও রাবণের যুদ্ধ। রাবণের ভাই বিভীষন নিজের স্বার্থের জন্য রামের পক্ষাবলম্বন করলে রাবণ পরাজিত হয়। বিভীষন পরে লংকাধিপতি হয়েছিলো।

পাকভারত উপমহাদেশে ও বিশ্বাসঘাতকতার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইংরেজদের পক্ষ নিয়ে নবাব সিরাজের আত্মীয় প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁ গদিতে বসার লোভে বেঈমানী করে। ১৭৫৭ সালে পলাশী প্রান্তরে কৌশলে সিরাজ সৈন্য বাহিনীকে ঘুমিয়ে রেখে ইংরেজদের জয় এনে দেয়। শুধু তাই, সিরাজকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে বাঙালির ইতিহাসে চির বেঈমানে পরিনত হয়েছে। মহীশুরের বীর টিপু সুলতান বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর আত্মীয় ও চাচা শশুর মীর সাদিককে। বিশ্বাস ভঙ্গ করে সাদিক নিভৃতে ইংরেজ পক্ষে গিয়ে শের এ টিপুকে পরাজিত ও গদিচ্যুত করে। ভারতের জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী যে দেহরক্ষীদের অগাধ বিশ্বাস করতেন তাদের‌ই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্রাশ ফায়ারে তিনি অত্যন্ত নির্দয়ভাবে নিহত হয়েছেন। সর্ব ভারতের নয়নমণি মহাত্মা গান্ধী কোনদিন‌ই বিশ্বাস করতেন না প্রকাশ্য দিবালোকে কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে। বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী বীর ও বাংলার সূর্য সন্তান মাস্টারদা সূর্যসেন একান্ত বিশ্বাস করেই বিপদে আশ্রয় নিয়েছিলেন গৈরলা গ্ৰামে ক্ষীরোদাপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে। তাঁর‌ই আপনজন নেত্রসেন বিশ্বাসঘাতকতা করে মাস্টারদাকে ধরিয়ে দিয়েছিলো। বিশ্বে, পাকভারত উপমহাদেশে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতকতার এমন বহু নজীর রয়েছে। আর ঐ সমস্ত বেঈমানদের জন্য দেশের মানুষকে চরম মূল্য ও দিতে হয়েছে।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ড বড়‌ই জগন্যতম ও হৃদয় বিদারক। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিলো অপরিমেয় ও অপরিসীম। তিনি বাংলার মানুষকে জীবন দিয়ে ভালোবাসতেন। তিনি বলেছেন,”আমার দুর্বলতা হচ্ছে আমি বাংলার মানুষকে খুব বেশি ভালোবাসি,। বঙ্গবন্ধুর এ বিশ্বাসের কারণেই স্বাধীন সার্বভৌম আজকের বাংলাদেশ। তাঁর জন্য‌ই অবসান হয়েছে এ দেশে বিদেশীদের শোষণ, বঞ্চনা, লাঞ্চনা, নির্যাতন আর অত্যাচার। বিশ্ব দরবারে আজ বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। বঙ্গবন্ধুর এমন নিঃস্বার্থহীন ভালোবাসাকে পদদলিত করে এবং তিনি যাকে বিশ্বাস করতেন বেঈমান মীরজাফরের পেতাত্মা মোশতাক‌ই তাঁর জন্য কাল হয়। মোশতাকের ষড়যন্ত্রে কতিপয় বিপথগামী সেন্য দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পরিবারবর্গসহ তিনি শহীদ হন। বঙ্গবন্ধুর চির বিশ্বাস ছিলো বাংলাদেশের মানুষ আর যাই করুক কেউ তাঁকে হত্যা করতে আসবেনা। সেদিন ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট তিনি মনে করেছিলেন হয়তো কেউ কোন কথা বা দাবী নিয়ে বাসায় এসেছে। সরল বিশ্বাসে তাদের সামনে এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন,” তোরা কি চাস?, কিন্তু নিষ্ঠুর পাষান্ডরা ফায়ারে ফায়ারে বিশ্বাসের কেন্দ্রস্হল তাঁর বক্ষটিকে ঝাঁজরা করে দিয়েছিলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানটির দেহ ইট পাথরের সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়েছিলো।

আর সেই ১৫ আগস্ট হতেই বাংলার আকাশ ও বাতাসে শোকের নহর বয়ে যাচ্ছে, মানুষ শোকের মূর্ছনায়। বাংলার আকাশ শুন্যতায় ভরা। এ বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অনেকে। আবার বাংলাকে নেতৃত্ব ও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মত হয়ে কেউ আসেননি। তাঁর মত এত ভালোবাসা আর কারো কাছে পাওয়া যায়নি। অন্য কেউ বাঙালিকে বঙ্গবন্ধুর মত ভালোবাসতে পারেননি। মীর জাফরের বংশধররা বাংলার মানুষ থেকে তাঁকে আলাদা করতে চেয়েছিলো-পারেনি, ব্যর্থ হয়েছে সম্পূর্ণ। তারা নিজেরা নিঃশেষ হয়েছে। ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে পাপিষ্ঠরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

এ বাংলার মাটি,ধূলিকণা, সাগর নদী জল,অরণ্য পাহাড়, সবুজ ফসলের খেত, গ্ৰাম নগর বন্দরে,বাতাসের শনশনে, কৃষকের হাসিতে শ্রমিকের বাঁশিতে, শিশুদের কোলাহল সম সর্বত্র বঙ্গবন্ধু প্রবাহমান। অনন্তকাল ধরে বঙ্গবন্ধু থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে ঠিক মধ্যস্হলে।

লেখকঃ সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)।