খোলা মত

আমার ভাই ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা

  জাগো নরসিংদী ২৪ ডিসেম্বর ২০২১ , ৪:০৬:অপরাহ্ণ অনলাইন সংস্করণ

নূরুদ্দীন দরজী

পৃথিবীর প্রতিটি জাতির ইতিহাসেই ঘটনাবহুল দিক আছে। বাঙালি জাতির ও আছে অনেক শোক ও গৌরবগাঁথা। আছে দুর্দিন,দুর্দশা ও মাথা উঁচু করার মত কাহিনী। সমগ্ৰ ঘটনাবলির মধ্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির এক গৌরবময় অধ্যায়। এ মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুকে ছাড়িয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে দীপ্তমান। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের শোষন নির্যাতন মোকাবেলায় ১৯৪৮ ও ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয়দফা,৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনসহ বিভিন্ন ঘটনা আমাদের অস্থিমজ্জায় গাঁথা। কিন্তু ৭১-এ নয় মাস ব্যাপি শসস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলন অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদা মন্ডিত। পাকিস্তানের শোষনের নাগপাশ থেকে মুক্তির জন্য দীর্ঘ নয় মাস বাঙালি যুদ্ধ করে অসংখ্য জীবন বিসর্জন দিয়েছে। হারিয়েছে মা বোনের ইজ্জত, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পেযেছে স্বাধীনতা। অর্জিত হয়েছে মহান বিজয়।

আমরা জানি যুদ্ধে ভালো ফলাফল বয়ে আসে না। কিন্তু তার পর ও জীবন সংগ্ৰাম,মুক্তির জন্য জাগরণ,শক্তি অর্জন ও সভ্যতার বিকাশে যুদ্ধ প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। কখনো বা একটি নিদির্ষ্ট স্হানের মানুষের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। যুদ্ধ জয়ে এসেছে অনেক জাতির স্বাধীনতা। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি পাকিস্তানীদের পরাজিত ও তাড়িয়ে অর্জন করেছে মহান স্বাধীনতা। আর এ জন্য‌ই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঙালির সকল ইতিহাসে মাইলফলক,ও সর্বোচ্চ অর্জন।
যারা জীবন বাজী রেখে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারা আমাদের গর্বেথ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাদের‌ই একজন ছিলেন আমার ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা কলিম উদ্দীন দরজী।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হ‌ওয়ার পূর্বে তিনি ঢাকাতে ছোটখাটো একটি চাকরি করতেন। বেশির সময় ঢাকাই থাকতেন। কিন্তু দস্যু পাকিস্তানীরা ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় নিরিহ বাঙালির উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে এক পর্যায়ে তিনি নিজের গ্ৰামের বাড়ি শিবপুরে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। এসে বসে ছিলেন না। এলাকায় হানাদার বাহিনীর প্রতিরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন। এক পর্যায়ে আমরা দুই ভাইয়ের পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি অন্যান্য বন্ধুদের সাথে যুদ্ধের প্রশিক্ষন গ্ৰহণে ভারতে চলে যান। কিছু দিন প্রশিক্ষন নিয়ে একটি সনদ পেয়ে যুদ্ধ করতে পুনরায় দেশের অভ্যন্তরে ফিরে আসেন। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, আমার ভাই কলিম উদ্দীন বঙ্গবন্ধুর প্রতি খুব‌ই বিশ্বস্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গর্ব করতেন, আশায় বুক বেঁধে থাকতন বঙ্গবন্ধুই পারবেন পশ্চিমাদের জুলুম নির্যাতনের হাত থেকে বাংলাদেশকে ও বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে । বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে তিনি প্রায়শই কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারণ করতেন। সঙ্গী সাথীদের সাথে একতাবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন রণাঙ্গণে শত্রুদের মোকাবেলায় সচেষ্ট থাকতেন।
একদিন হানাদার পাকিস্তান বাহিনী আমাদের গ্ৰামে ঢুকে পড়েছিল। তাদের টার্গেট ছিল একজন বিশিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ঝিনুক খানের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া। গ্ৰামের সদর রাস্তা দিয়ে গিয়ে তারা ঐ বাড়ি টার্গেট করে ফিরে আসার পথে আমাকে পথে পেয়ে মারতে থাকে। আমার আপরাধ ছিল আমি হানাদারদের ঝিনুক খানের বাড়ি যাওয়ার দূর বাঁকা রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিলাম। ফিরে এসেই আমাকে পেয় বেধরক লাঠিপেটা করতে করতে থাকে। আমার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে গুলি করে মেরে ফেলার জন্য। মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান এসে আমি অল্প বয়সী ছেলে মানুষ, বুঝতে পারিনি বুঝিয়ে সুঝিয়ে কোন রকমে রক্ষা করেন। তারপর ও লাঠি দিয়ে অনেক মেরেছিল। আমার ভাই তখন সেখানে ছিলেন না। কিছুক্ষণ পর বাড়িতে এসে আমাকে আদর করে বুকে জড়িয়ে তাদের মারার প্রতিশোধ নিবার সংকল্প করেন। ঐ দিন সন্ধ্যার পর একটি গ্রেনেড নিয়ে হানাদারদের ক্যাম্পে চার্জ করে নিরাপদে ফিরে আসেন যা এখন আমার কাছে লোমহর্ষক ও রোমাঞ্চিত ইতিহাস। শুনেছি ঐ গ্রেনেড বর্বরদের অনেক ক্ষতি করেছিল। ফিরে আসার পর আমি ভাইয়ের চোখেমুখে আনন্দ হাসি দেখেছিলাম। অনুরুপভাবে আমার ভাই কলিম উদ্দীন দরজী হানাদেরদের বিরুদ্ধে একক ও দলীয়ভাবে অনেক প্রতিরোধ গড়ে তুলে যুদ্ধ করে অক্ষত অবস্হায় ফিরে এসেছিলেন। তাঁর মুখে আমি ভারতে প্রশিক্ষন সহ অনেক যুদ্ধ কাহিনী শুনেছি। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলে আমার ভাই অনেক আনন্দিত হয়েছিলেন যা আমি যেন এখনো দেখতে পাচ্ছি। কঠিন শাস্তি দেওয়ার জন্য রাজাকার আলবদরদের খুঁজে খুঁজে বের করতেন। একজন রাজাকারকে অনেক পিটুনি দিয়ে ও ছিলেন।

আমার এ ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা কলিম উদ্দীন দরজী আজ আর বেঁচে নেই। বার্ধক্য জনিত কারণে তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন বিগত ১ নভেম্বর ২০২১ সাল তারিখে-(ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। তাঁর জানাজা হয়েছে আমাদের স্হানীয় ঈদগাহ মাঠে। জানাজার আগে তাঁকে রাষ্টীয়ভাবে” গার্ড অব অনার, প্রদান করা হয়েছে। তাঁর লাশটি আচ্ছাদিত করা হয়েছিল আমাদের প্রাণের প্রতীক জাতীয় পতাকা দিয়ে। আমি ও আমাদের পরিবার জাতির এ বীর সন্তানকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করায় অনেক খুশি। কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যাঁর চিন্তা ও প্রচেষ্টার ফসল আজকে মুক্তিযোদ্ধাদের এ বিরল সম্মান।

সুপ্রিয় পাঠক মহোদয়গণ, আমি আমার ভাইকে হারিয়ে খুব‌ই অসহায় বোধ করছি। আমার ভাই আমাকে কত যে ভালোবাসতেন তা বুঝিয়ে বলার ভাষা আমার নেই। বার্ধক্যে পড়ে মাঝে মধ্যে একটু আধটু বিরক্ত করতেন। জীবনে দুই একবার হয়তো কিছুটা রাগ করেছি, যে কথা মনে হলে আজ অন্তর বিদীর্ণ হয়। সবার প্রতি বিনীত অনুরোধ,দয়া করে আমার ভাইয়ের জন্য একটু দোয়া করেন। দোয়া করবেন যেন,রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন। আমার ভাইসহ সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি কৃতজ্ঞ চিত্তে শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখাটি শেষ করছি।

লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)।

আরও খবর

আরো খবর