খোলা মত

শেখ ফজলুল হক মণির সাথে ক্ষণিক দেখা

  জাগো নরসিংদী ৪ ডিসেম্বর ২০২১ , ১১:০৫:পূর্বাহ্ণ অনলাইন সংস্করণ

নূরুদ্দীন দরজী

বাংলাদেশে আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন এক নিবেদিত প্রাণ রাজনৈতিক। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে তাঁর বিরাট ভূমিকার কথা বাঙালি জাতি কোন দিন ভুলতে পারবে না। তিনি ছিলেন যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।আজ ৪ ডিসেম্বর এ মহান নেতার ৮২তম জন্মদিন। ১৯৩৯ সালের আজকের দিনে টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নৃশংস ভাবে হত্যার দিন সকলের প্রিয় মণি ভাই ও তাঁর অন্তসত্ত্বা সহধর্মিণী বেগম আরজু মণিকে ও নিষ্ঠুর ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

এ মহান নেতার সাথে একদিন সহসা বলতে গেলে আচমকা আমার সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয়েছিল। যদিও সাক্ষাতটি ছিল ক্ষণিক তরে, কিন্তু তার প্রভাব ও স্মৃতি আমি জীবন ভর বয়ে যাচ্ছি। মহান রাব্বুল আলামীনের দয়ায় সেদিনের ক্ষণিক সাক্ষাতটি আমর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

অনেক স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি সেদিনের কথা মনে হলে। সবে মাত্র এস,এস,সি পাশ করেছি। বাড়িতে কর্মক্ষম কোন উপযুক্ত লোক নেই। মা বাবা অনেক আগেই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। বোনদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় কোন মহিলাই বাড়িতে ছিল না। সে অবস্হায় সংসার করতে বাধ্য হ‌ই। কিন্তু নিজের উপার্জনের কোন‌ই পথ ছিলনা বিধায় শ্বশুর অবসরে গেলে তাঁর পরামর্শ মোতাবেক প্রাথমিক শিক্ষক পদে আবেদন করি। তখন কোন প্রাথমিক শিক্ষক অবসরে গেলে বা কোন কারণে চাকরি না করলে তাঁর ছেলেমেয়/মেয়েজামাই সে পদে আবেদন করতে পারতো। নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এস,এস,সি। বিভাগীয় বোর্ড ইন্টারভিউ নিয়ে সে প্রার্থী যোগ্য বিবেচিত হলে কেউ কেউ চাকরি পেয়ে যেতো অর্থাৎ শিক্ষক হতে পারতেন। শ্বশুরের পরামর্শে আমি আবেদন নিয়ে ঢাকার জেলা অফিসে যাই। কিন্তু অফিসের বড় সাহেব সামান্য ত্রুটির কারনে আমাকে কোন পাত্তাই না দিয়ে অনেক রাগ দেখিয়ে দুচার কথা শুনিয়ে বের করে দেয়। আমি জীবনের প্রথম আবেদনে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি ভেবে খুব‌ই চিন্তিত ও বিমর্ষ হয়ে পড়ি। অনেক চেষ্টা করে ও কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না।

ঢাকা থাকার এমন অবস্হায় বড় ভাইয়ের মেস বাসার অনেকটা কাছে”দৈনিক বাংলার বাণী, অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে এক রাতে দেয়ালে সাঁটানো পত্রিকা পড়তে পড়তে অনেক রাত হয়ে যায়। সাথেই ছিল চাকরির আবেদন পত্রটি, আর মনে ছিল কেমন জানি ব্যর্থতার অজানা বেদনা। তখন রাত প্রায় এগারটা। তারিখ ২ এপ্রিল/১৯৭৩ সন। হঠাৎ দেখি এক জন লোকের নেতৃত্বে বেশ কিছু লোক “দৈনিক বাংলার বাণী, ভবনের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন। আমার মনে হলো নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিটিই শেখ ফজলুল হক মণি। যার কথা তখন ছিল মানুষের মুখে মুখে। সাহস করে আমি ও তাদের গ্ৰুপে ঢুকে পড়ি এবং তালে তালে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এক‌ই সাথে মণি ভাইয়ের চেম্বারে ঢুকে যাই। সামনে রক্ষিত একটি চেয়ার টেনে অন্যান্যদের সাথে এক পাশে বসি। মণি ভাই খুব‌ই সংক্ষিপ্ত ভাবে সাংগঠনিক কথাবার্তা বললেন। সবার সাথে কথা বলা প্রায় শেষ হলে আমার উপর মহান ব্যক্তিটির দৃষ্টি পড়ে। তিনি বলেন, তুমি কে? চিনতে পারলাম না যে! কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে ও বলি, আমার বাড়ি নরসিংদীর শিবপুরে। প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক পদে আবেদন করেছি। আমাকে সহযোগিতা করার কেউ নেই বলে আবেদন পত্রটি তাঁর সামনে টেবিলে রাখি। সাথে সাথে আবেদন পত্রটি হাতে নেন এবং পড়ে বলেন, শিবপুরের এখনতো সবচেয়ে বড় মানুষ রবিউল আওয়াল কিরণ‌ইতো দেখছি তোমার সাথে আছে-কেউ নাই বলছো কেন। কাল বিলম্ব না করে ,Recommend.লেখলেন। অনেক রাত হ‌ওয়ায় সালাম দিয়ে বের হয়ে ভাইয়ের কাছে ফিরে যাই।

পরের দিন সকল ১০টায় শিক্ষা অফিসে গিয়ে বড় সাহেবকে পেয়ে যাই। তিনি আমায় দেখে আবার ও রাগ হয়ে যান। অনেক অনুরোধ করে তার হাতে আবেদনটি দিলে তিনি পড়তে পড়তে আমাকে বসতে বলেন। আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? সেদিন আপনাকে খুঁজে ছিলাম এসব বলে কয়ে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট ক্লার্ককে ডেকে এখনি আবেদনটি Put up করতে বললেন। আমার ইন্টারভিউ সহ সকল যথাযথ প্রক্রিয়া অনুস্মরণ করে অল্প দিনের মধ্যেই আমাকে নিয়োগ দান করলে আমি শিক্ষকতার মত মহান পেশায় যোগদান করি এবং অনেক দিন এ পেশায় কাজ করি।

পরবর্তীতে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে উর্ধতন পদে আবেদন করি ও উত্তীর্ণ হয়ে সহকারি শিক্ষা অফিসার,উপজেলা শিক্ষা অফিসার হ‌ই। সর্বশেষ রিসোর্স পার্সন পদে চাকরি করে বর্তমানে অবসরে আছি। কমবেশি মর্যাদা নিয়ে সমাজে বসবাস করছি।

আজকে মণি ভাই নেই। আমি ও একদিন থাকবো না। কিন্তু সেদিনের সে স্মৃতিগুলো যেন পাহাড় সম হয়ে স্মৃতির দুয়ারে এসে বার বার ভীড় করে। মণি ভাইয়ের সেদিনের প্রতিদান আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আমার মত ক্ষুদ্র মানুষ কিই বা করতে পারি। শুধু আমি প্রাণ ভরে মণি ভাইয়ের বিদেহি আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। হে আল্লাহু! পরম করুনাময়, আপনি মণি ভাইকে জান্নাতুন ফেরদৌস নসীব করুন । আমিন।
শেখ ফজলুল হক মণির ৮২তম জন্মদিনের স্মরণে এ সামান্য কটি কথা।

লেখক : সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (টিইও)।

আরও খবর

আরো খবর