1. jagonewsnarsingdi@gmail.com : nurchan :
শুক্রবার ৩রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ সকাল ৭:২৬

চাকরি জীবনের প্রথম বেতন পেয়েছিলাম ১২০ টাকা

  • প্রকাশিতঃ সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১
  • ৩১০ বার

নূরুদ্দীন দরজী

১৯৭৩ সাল। সবে মাত্র প্রথম বিভাগে এস, এস, সি পাশ করেছি। ১৯৭২ সালের পরীক্ষার্থী। দেশ স্বাধীন হ‌ওয়ায় সে বছর পরীক্ষা হলে ও স্বাধীন ছিলাম। বর্তমান করোনা কালীন অটোপাশের মত পাশ করতে হবে। যার যার মত‌ই পরীক্ষা দিয়েছে । পাশের হার ছিল প্রায় শতভাগ। রসিক জনরা বলতো, সে বছর টুল টেবিল ও নাকি পাশ করেছে।আমার চাচা শশুর পরম শ্রদ্ধেয় মরহুম রিয়াজ উদদীন খান প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ১৫ টাকা বেতনে শুরু করে ঐ সময় তাঁর বেতন হয়েছিল ১১০ টাকা। স্বাস্থ্যগতকারণে তাঁর পক্ষে আর চাকরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি একদিন লাল চায়ের সাথে মুড়ি মিশিয়ে খেতে খেতে আমাকে তলব করেন। বান্দা হাজির হ‌ই। উপদেশের মত বলেন, তুমি অল্প বয়সে বিয়েশাদী করে ফেলেছ,সংসার হয়েছে,খরচ করতে হবে। তোমার একটি কিছু ঊপার্জনের ব্যবস্থা করা উচিত। আমি শুধুই জ্বি,জ্বি,বলে যাচ্ছিলাম। বিলম্ব না করে বলে ফেলেন- আমার পদে আবেদন লিখে আন,আমি Recommendation করে দেই, তোমার মাস্টারী চাকরি হয়ে যাবে। জো হুকুম! রাজী হয়ে যাই।যদিও বয়স হয়নি। মনে মনে খুবই আনন্দিত হই-শিক্ষক হবো,অনেক বড় একটি কিছু । হুকুম তামিল করি, দরখাস্ত হাতেই লিখে ফেলি। শশুর মহাশয় সুন্দর মত সুপারিশ করে দেন। তখন আমাদের এমপি ছিলেন রবিউল আউয়াল খান কিরন। আমার আরেক চাচা শশুর আবদুল হান্নান খান মাননীয় এমপির কাছে নিয়ে যান সুপারিশ করাতে। এমপি মহোদয় অনেক কিছু লিখে সুপারিশ করে দেন। আবেদন নিয়ে চলে যাই ঢাকায়।

তখন আমাদের জেলা ঢাকা। ঢাকা জেলা প্রাইমারি শিক্ষা অফিসটি ছিল শহরস্হ হাটখোলায়। খুঁজে খুঁজে আবেদনটি নিয়ে জেলা অফিসে যাই। সৌভাগ্যক্রমে বড় স্যারকে পেয়ে যাই। অন্যদের শিখিয়ে দেওয়া মতে অনুমতি নিয়ে বড় স্যারের কক্ষে ঢুকি, সালাম দেই। কেন এসেছি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। অতীব বিনয়ের সহিত আবেদন পত্রটি তাঁর হাতে দেই। তিনি মনোযোগসহ পড়েন। জিঞ্জেস করেন, কোন সালে পাশ করেছি। উত্তরে ১৯৭২ সাল বলি। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। কারণ আমার আবেদনে”শারীরিক, বানান ভুল। ঈ-কারের জায়গায় ই-কার লেখা ছিল। ৭২-সালের পাশ বলে অনেক তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলেন। রাগের মাথায় আবেদন পত্রটি ছুড়ে টেবিলের নিচে ফেলে দিলেন। ভয়ে আমি কম্পমান। অনেক কথা শুনে ও ছুড়া আবেদনটি কুঁড়িয়ে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বের হয়ে আসি। মনে হচ্ছিল জান বাঁচানোই যেন ফরজ। কপাল মন্দ ৭২-এর পাশ।ই-কার ও ঈ-কারের সমাধান করে অন্য লোকের রেফারেন্সে কয়েক দিন পর আবার যাই। রেফারেন্সের বদৌলতে সেদিন বড় স্যার তেমন কিছু বলেন নাই। অল্প পড়ে রহিম সাহেব নামের জনৈক করণিককে ডেকে Put up করতে বলেন। নিয়ম অনুসারে অনুমোদনের জন্য আবেদন জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট পাঠানো হয়। সেখানে ও ৭২ – এর পাশ মনে করে প্রার্থীর ইন্টারভিউ নিয়ে ফলাফল জানানোর নির্দেশ আসে। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে ইন্টারভিউ নেওয়া হবে মর্মে আমাকে তারিখ জানিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে আর বাড়ি আসা হয়নি। ঢাকার জয়কালী মন্দিরের কাছাকাছি বড় ভাইয়ের মেস বাসায় ছিলাম। প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ নেই। কি লিখবো জানি না বুঝে ও নির্ধারিত তারিখে ইন্টারভিউতে অংশ গ্ৰহণ করি। তিন দিন পর ফলাফল জানানো হয়। আল্লাহর রহমতে লিখিত ৭৫ নম্বরের মধ্যে ৬০ এবং মৌখিক ২৫ নম্বরের মধ্যে ২০ সহ মোট ৮০ নম্বর পাই। অফিসের সবাই খুশী হয় এবং পুনরায় ডিসি স্যারের অনুমোদন নিয়ে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমাকে শিক্ষকতার মত মহান পেশায় নিয়োগ পত্র প্রদান করা হয় মহা আনন্দে চলে আসি বাড়ির পাশের স্কুলে জয়েন করবো। ছাত্রছাত্রীকে পড়াব,তারা আমাকে স্যার বলবে। তখন সে স্কুলের হেডমাস্টারের সাথে সাক্ষাৎ করি। কিন্তু সাক্ষাৎ সুখের হয়নি। আবার সেই ৭২ । ৭২ এর পাশের প্রসঙ্গ এনে হেড মাস্টার স্যার ও অবহেলায় অনেক কিছু বলেন । কিন্তু বাধ্যবাধকতার কারণে জয়েন করতে দিলেন। শুরু হয় আমার শিক্ষকতার জীবন। তখন শিবপুরের থানা শিক্ষা অফিসার ছিলেন নূরুল ইসলাম স্যার। আমার কথা শুনে নাকি বলেছিলেন, এরা কি পড়াবে?

যাই হোক, শিক্ষক হয়েছি। মনে প্রাণে চেষ্টা করেছি ছাত্রদের ভালোভাবে পড়োশুনা করাতে। সবে মাত্র এস, এস, সি পাশ হ‌ওয়ায় আগের পড়াশুনার রেশ ফুরিয়ে যায়নি বলে বোধ হয় ভালোই করছিলাম। আস্তে আস্তে সবার ভুল কিছু কিছু ভাংতে লাগলো। হয়তো কেউ কেউ ভেবে নিয়ে ছিল ৭২ – এর সব ছাত্রছাত্রীই খারাপ ছিল নয়।অনেকেই ভাগ্যের ফেরে পড়েছে।

প্রায় দুই মাস পর বেতনের খবর হলো। বেতন আনতে হবে নরসিংদীর লাকরি পট্রির সোনালী ব্যাংক থেকে। ব্যাংক থেকে বেতনের ১২০ টাকা নিয়ে ৫৫ পয়সা বাস ভাড়া দিয়ে ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য ঢাকার পথে ডেমরা চলে যাই। শীতলক্ষ্যা পার হয়ে ১০ পয়সা ভাড়ায় ঢাকায় ভাইয়ের কাছে পৌছি। আমার ভাই খুব‌ই খুশী হন। আমরা তিন ভাই ছিলাম। বাড়িতে থাকা সবার বড় ভাইয়ের জন্য ৩ টাকায় লুঙ্গী, স্ত্রীর জন্য ৬ টাকায় সুন্দর একটি ছাপা শাড়ী। মা বাবা জীবিত ছিলেন না। শশুর শাশুড়ীর জন্য কিছু কাপড়চোপর ক্রয় করি। কিছু মিষ্টি নিয়ে বাড়ি আসি। স্কুলে ও মিষ্টি নেই। অসুস্থ শশুরের জন্য বড় দেশি কৈ মাছের ব্যবস্বা করি। অনেক কেনাকাটার পর ৮০ টাকা শাশুড়ীর হাতে দেই। শাশুড়ী মা অনেক খুশী হয়ে দোয়া করেন। এ ভাবেই চলতে থাকে চাকরি জীবন।

পরে সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং সর্বশেষ উপজেলা শিক্ষা অফিসার পদে থেকে অবসর গ্ৰহণ করি। তার পর ও দুই বছর রিসোর্স পার্সন পদে চাকরি করি। শেষ জীবনে এসে বেতন পেতাম প্রায় ৪০ হাজার টাকা -যে পদে এখন বেতন ৬০ হাজার টাকার ও বেশি। প্রথম বেতনের চেয়ে শেষের বেতনের পরিমাণ প্রায় ৩৩৩ গুন হলে ও ১২০ টাকা দিয়ে যা পাওয়া যেতো, যেভাবে চলা যেতো শেষের অনেক টাকায় যেন কুলিয়ে উঠা সম্ভব হয়না। সেই ৭২ আজ আর নেই,চলে গেছে বহুদিন, পদ্মা,মেঘনা যমুনায় বয়ে গেছে কত না স্রোত। যতটুকু জানি সে সময়ের স্যারেরা কেউ আর পৃথিবীতে নেই। ঘটনাগুলো স্মৃতির আয়নায় ভেসে ভেসে মধুর বেদনায় আজ ও হাসায়,কাদায়। এরই যৎ সামান্য লিখে পাঠকগণের ধৈয্যচ্যুতি ঘটিয়েছি বলে দুঃখ প্রকাশ করছি।

লেখকঃ সাবেক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (টিইও)

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
আরো খবর.
© জাগো নরসিংদী ২৪ আইটি সহায়তাঃ সাব্বির আইটি
Customized By BlogTheme