খোলা মত

আরজুকে আর দেখা যায়না

  জাগো নরসিংদী ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ , ৩:১৫:অপরাহ্ণ অনলাইন সংস্করণ

নূরুদ্দীন দরজী

আরজুকে আমরা এখন আর দেখতে পাই না। আরজু নেই শিবপুরে , নেই বাসস্ট্যান্ডে, নেই কোন দোকানে ও আসেনা কোন মসজিদে নামাজ পড়তে। অনেক রোড, বিশেষ করে নরসিংদী হতে শিবপুর-মনোহরদী রোডে যাতায়তকারী সুহৃদ পাঠকবৃন্দসহ অনেকেই বাসে অথবা বাসস্ট্যান্ডে একজন আরজুকে নিয়মিত দেখতেন।। এক বছরের ও বেশি সময় যাবৎ আরজুকে দেখা যায়না, কারো আর সাহায্য করতে হয়না, তার ডাক শোনা যায়না। আর আসবে ও না কোন দিন সে ভবের এ বাজারে।

মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর এ মনুষ্য সমাজ সৃষ্টি করেছেন বড়‌ই বিচিত্র রুপে। এখানে নানা শ্রেণির মানুষের বিচরণ। ধনি-গরিব নির্বিশেষে এখানে আছেন স্বচ্ছল সুধীজন,আছে অসহায়, অন্ধ-বধির বিকলাঙ্গ। সকলের মাঝে মিশে রয় ফকির দরবেশ ও রহস্যে ঘেরা আধ্যাত্মিকতায় ভরা কত না জন। তারা সবাই এক‌ই সমাজে বসবাস করে, সুখে ও দুঃখের সাথী হয়ে চলে যায় তাদের জীবন। এ সমাজে আছে মুসলিম-হিন্দু,বৌদ্ব-খ্রিস্টান, সাদা-কালো সকলের জন্য সমান অধিকার। মানুষ যার যার কর্ম করে বেঁচে থাকে -যার কর্ম সে করে। এমনিভাবে চলতে চলতে বেঁচে থাকে সৃষ্টি, কল্যাণ আসে মানুষের ও মানবতা পায় পূর্ণতা। সভ্যতা যায় এগিয়ে।

শিবপুরে আমাদের সমাজেই বসবাস ছিল আরজুর। তার ছিল মোটামটি দীর্ঘকায় দেহ, উজ্জ্বল বর্ণ ও সুশ্রী চেহারা। শরীরের অন্য সব অঙ্গ ঠিক থাকলে ও ছিলনা চোখের জ্যোতি। ভাগ্য বিড়ম্বিত আরজুর চার বছর বয়সেই দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে গিয়েছিল। মা-বাবার আদরের দুলাল মহান করুনাময় তাঁর এ বান্দাকে দুনিয়ায় রেখেছিলেন প্রায় ৬০ বছর। আরজু এ দীর্ষ অন্ধকার জীবনের ছিলেন সজীব বাসিন্দা।চোখের আলো না থাকলেও তার উপস্থিতি ছিল শিবপুর,মনোহরদী তথা নরসিংদীর প্রায় সর্বত্র। পৃথিবীর এ সুন্দর সবুজ প্রান্তে তার নির্বিঘ্ন চলাচলের উপায় ছিল না। বড় বোন সাজু আক্তারের হাত ধরে ধরে চলেছেন প্রথম জীবনে, এখানে-সেখানে,গ্ৰামে-গঞ্জে বাসে ও বাসস্ট্যান্ড। অন্ধ হিসেবে মানুষ তাকে সাহায্য সহযোগিতা করতো। আমরা জানি অন্ধদের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি সহজাত মমত্ববোধ থাকে। কারণ পৃথিবীতে অন্ধদের মত ভাগ্যহত আর কেহ নয়। তাদের দিন-রাত,সকাল-সন্ধ্যা এক‌ই রকম। পরিচিত জনদের সহায়তায় বউ-ঝি এবং ছেলে-মেয়ে নিয়ে তার সংসার কেটে যাচ্ছিল। আরজুর একটি মাত্র ছেলে ও তিনটি মেয়ে রয়েছে, স্ত্রী রীনা বেগম স্বামীর প্রতি খুবিই কর্তব্য পরায়ন। ছেলেটি পড়াশুনা করছে মাধ্যমিক পর্যায়ে। মেয়েদের মধ্যে দুই জনের বিয়ে হয়ে গেছে।

আরজু মিয়া ওরফে আরজুর জন্ম নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দত্তেরগাঁও ভিটিপাড়ায়। এক সময় এক খন্ড জমি কিনে নিজেই বাড়ি করেন পাশের গ্ৰাম ধানুয়ায়। শিশুকালে মারাত্বক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অন্ধ হয়ে যায়, হয় চির অন্ধ। অনেক চিকিৎসা করে ও চোখের আলো আর ফিরে পাননি। চলেছে তার দুঃসহ কঠিন জীবন। এর‌ই মাঝে আরজুর যোগাযোগ ছিল এলাকায় বিভিন্ন গ্ৰেণির মানুষের সাথে । এলাকার নানা স্তরের নেতৃবৃন্দের সাথে মাঝে মধ্যে সাক্ষাৎ করতেন সহযোগিতা ও শান্তনা পেতেন। প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া আরজুকে চিনতেন। এলাকায় এলে আরজু তাঁর কাছে যেতেন। মান্নান ভূঁইয়া ও আরজুর কুশলাদি জিজ্ঞাসা করতেন, সান্ত্বনা দিতেন ও সহযোগিতা করতেন।

আরজু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। কোন মসজিদে এলেই বুঝা যেতো আরজু এসেছে। নামাজে প্রায়‌ই পিছনের লাইনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর বলে ডাকতেন। মাঝা মাঝে নিজ ইচ্ছায় কতিপয় সাধারণ মুসুল্লিদের নামাজ বিষয়ে কিছু কিছু হেদায়েত ও করতেন।

সারা দিন ঘুরে ফিরে এশার নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরা হতো আরজুর । স্ত্রী-পুত্র সন্তানাদি নিয়ে সুন্দর ভাবেই কেটে যেতো দিন। সংসারে ছিল শৃঙ্খলা। পরিবারের সবাই তার কথা শুনতো, কাজ করতো ও এক হয়ে চলতো। বলতে গেলে যা আছে তাই নিয়ে যাকে বলে সুখের সংসার। শিক্ষার অনেক সংজ্ঞার মধ্যে একটি হলো- ‘নিজে উপার্জন করে পরিবার পরিজন নিয়ে সঠিকভাবে চলতে পারার দক্ষতাকেই শিক্ষা বলে।’ এ অর্থে আরজু শিক্ষিত।

আমি যে আরজুকে নিয়ে এতগুলো কথা বললাম, পাঠকগণের হয়তো বা ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়েছি সে আর এ পৃথিবীতে নেই। ভাগ্যাহত আরজুর শরীরে পানি এসে, প্রস্রাবের সমস্যা সৃষ্টি হয়ে, বেশ কয়েক দিন জ্বরে ভোগে তার অদেখা মায়াবী সুন্দর এ ধরণী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আরজু চলে গেছেন এক বছরের ও বেশি সময় আগে। তার কথা খুবই মনে পড়ে। মনে হয় এই বুঝি আরজু আসছে-আল্লাহু আকবর বলে সর্ব কুলের মালিককে ডাকছেন। কিন্ত না! তাকে আর দেখি না। আরজু অসীম শূন্যতায় পাড়ি জমিয়েছেন।

আমার মনের আকুতির কারণে একজন অখ্যাত মানুষ সম্পর্কে লিখে পাঠকগণকে বিরক্ত করেছি বলে দুঃখ প্রকাশ করছি। আরজুর পরকালীন জীবনে মহান রাব্বুল আলামিন যেন তাকে শান্তিতে রাখেন, বেহেস্ত নসিব করেন সবাই এমন দোয়ই করবেন অনুরোধ রাখছি। করুনাময়ের নিকট প্রার্থনা-

হে প্রভু, আরজুর জীবনে তুমি দিয়েছিলে
নিকষ অন্ধকার জুড়ে,
পরপাড়ে এখন তুমি রাখিও তাকে, তোমার
অসীম দয়ায় ভরে।

লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার টিইও  (অব:)

আরও খবর

আরো খবর